বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে বিপর্যয় আনতে পারে ট্রাম্পের ‘বিগ বিউটিফুল বিল’

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র দেশগুলো

ব্যাপক শুল্কনীতি প্রয়োগ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ব্যাপক শুল্কনীতি প্রয়োগ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিনির্ভর দেশগুলো। এর মাঝে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ অনুমোদনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে মার্কিন রেমিট্যান্সনির্ভর অনেক দেশ। বিশেষ করে বিশ্বের দরিদ্রতম কিছু দেশে এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। খবর দ্য ন্যাশনাল।

প্যারিসভিত্তিক আইনজীবী লরা স্নাইডারের মতে, রেমিট্যান্স কর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে অনথিভুক্ত, দরিদ্র ও যাদের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সম্পদ নেই এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এ অর্থের আসল প্রাপকরা। তারা সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র। করের কারণে অতিপ্রয়োজনীয় অর্থ কম পরিমাণে পাবেন তারা।’

ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিলের খসড়ায় সংশোধনী এনে রেমিট্যান্সের ওপর প্রস্তাবিত ৩ দশমিক ৫ শতাংশ আবগারি শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে সিনেট। এরপর প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয় বিলটি। এ আইনে আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা সেখান থেকে ইস্যু করা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পাঠানো রেমিট্যান্স এ করের আওতামুক্ত থাকবে।

নগদ অর্থ, মানি ট্রান্সফার পরিষেবা, ক্যাশিয়ার চেক বা একই ধরনের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হলে রেমিট্যান্স কর প্রযোজ্য হবে। প্রাথমিক প্রস্তারের ৩ দশমিক ৫ থেকে শুল্ক ১ শতাংশে নেমে আসায় অনেক মার্কিন অভিবাসী ও বিদেশী কর্মী খুশি হতে পারেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় জয়েন্ট কমিটি অন ট্যাক্সেশনের (জিসিটি) বলে, খসড়ায় উল্লেখিত হারের তুলনায় ১ শতাংশ রেমিট্যান্স কর প্রায় ১০ গুণ বেশি রাজস্ব আনবে। যার আকার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।

গ্রিন কার্ডধারী, ভিসাধারী, অস্থায়ী বাসিন্দা ও বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদের ওপর নতুন এ করের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে। এছাড়া এইচ-ওয়ানবি ও এইচ-টুবি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশী কর্মীরাও এর আওতায় পড়বেন। মার্কিন নাগরিকরা এ কর থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো ‘যোগ্য’ মানি ট্রান্সফার পরিষেবার মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। এ কর রেমিট্যান্স পাঠানোয় ব্যবহৃত কোম্পানির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে এবং প্রান্তিক ভিত্তিতে মার্কিন অর্থ বিভাগে জমা হবে।

আগামী ৩১ ডিসেম্বরের পর কার্যকর হতে যাওয়া রেমিট্যান্স কর ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের একটি অংশ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, এটি অবৈধ অভিবাসন নিরুৎসাহিত করবে।

মেক্সিকো এ আইনের বিরোধিতা করেছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে দেশটি, যার আকার ৫৩ বিলিয়ন ডলার। শিকাগোয় বসবাসরত এক মেক্সিকোন নিয়মিত বাবাকে অর্থ পাঠান। তার মতে, নতুন আইন রেমিট্যান্স পাঠানো কঠিন করে তুললেও মানুষ দমে যাবে না। কারণ ‘ওষুধ কেনা বা বাড়ি ভাড়া যা-ই হোক অনেকে রেমিট্যান্সের জন্য অপেক্ষা করে। যারা টাকা পাঠাতে চায়, তারা অন্য উপায় খুঁজে নেবে।’

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের গবেষক হেলেন ডেম্পস্টার বলেন, ‘আর অনেক দেশের জন্য এটি কার্যত একমাত্র অর্থায়নের উৎস।’

ব্যক্তিগত পর্যায়ে খাদ্য, ওষুধ বা ভাড়া মেটাতে সাহায্য করে রেমিট্যান্স। অন্যদিকে উন্নয়ন সহায়ক আর্থিক প্রবাহ হিসেবেও কাজ করে এটি। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জিডিপিতে রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ২০২৩ সালে তাজিকিস্তানের জিডিপির ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল রেমিট্যান্সনির্ভর। অন্যদিকে ভারতে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছে, যার আকার ৯৩ বিলিয়ন ডলার। মেক্সিকোর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় রেমিট্যান্স প্রাপকদের মধ্যে রয়েছে ভারত ১৬ বিলিয়ন ডলার, ফিলিপাইন ১৩, চীন ১৩ ও পাকিস্তান ৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া লেবানন, জর্ডান, তিউনিসিয়া, ইরাক ও সৌদি আরবসহ অনেক দেশ রয়েছে এ তালিকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃহত্তর পরিসরে মার্কিন রেমিট্যান্সনির্ভর দরিদ্রতম অর্থনীতিগুলোয় ব্যাপক অসংগতি তৈরি হবে। কারণ এখনো উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় বৈদেশিক অর্থ উৎস রেমিট্যান্স, যা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ও সরকারি উন্নয়ন সহায়তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

হেলেন ডেম্পস্টার বলেন, ‘ভারতের মতো দেশ রেমিট্যান্স করের প্রভাব সামাল দেয়ার সক্ষমতা রাখে, কিন্তু জর্ডানের মতো দেশের পক্ষে তা কঠিন।’

এ করের ফলে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার হন্ডুরাস, এল সালভাদর ও গুয়াতেমালাসহ অনেক দেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হেলেন ডেম্পস্টার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় দরিদ্র দেশগুলো আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন রেমিট্যান্স কর বসানো মানে তাদের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়া। দেশগুলো জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও হিমশিম খাবে।’

এখন রেমিট্যান্স পাঠাতে মার্কিন অভিবাসীরা বিকল্প পথ খোঁজে নেবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আটলান্টিক কাউন্সিলের জিওইকোনমিকস সেন্টারের গবেষক অনন্যা কুমার বলেন, ‘এ ধরনের দমনমূলক কর মানুষকে বিকল্প উপায়ে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করে। কারণ তাদের চাহিদা তো পরিবর্তন হচ্ছে না। ফলে তারা কম নিয়ন্ত্রিত, কম স্বচ্ছ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকবে, যা নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি করবে।’

আরও